অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে আগ্রাসন চালাচ্ছে ইসরাইল। দেশটির নির্বিচার বোমা হামলায় গাজা এরই মধ্যে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। এখন উপত্যকার ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ করে অন্যত্র পুনর্বাসনের কথা বলছে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ। এবার জানা গেল, গাজাবাসীকে আফ্রিকার দেশ কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে পাঠাতে চায় তারা।

গত ৭ অক্টোবর নতুন করে সংঘাত শুরুর পর ইসরাইলের হামলা থেকে বাচতে গাজার ২৩ লাখ অধিবাসীর বেশিরভাগই তাদের ঘরবাড়ি ও ভিটেমাটি ছেড়ে পালিয়েছে। উদ্বাস্তু হয়ে তারা এখন বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিয়েছে। অনেকেই খোলা আকাশের নিচে অস্থায়ী শিবিরে তাঁবু টানিয়ে রয়েছে।

 

এসব উদ্বাস্তুকে এবার গাজা থেকেই তাড়ানোর ষড়যন্ত্রে নেমেছে ইসরাইল। অবশ্য সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকেই গাজাবাসীকে জর্ডান ও মিশরের সিনাই মরুভূমিতে চলে যাওয়ার কথা বলছেন দেশটির কর্মকর্তারা এবং এটাকে তারা ‘স্বেচ্ছা পুনর্বাসন’ হিসেবে অভিহিত করছেন। তবে ইসরাইলি নেতাদের এমন বক্তব্যের কঠোর নিন্দা জানিয়েছে মিশর ও জর্ডান।

তবে গাজাবাসীকে তাদের স্বদেশ থেকে তাড়ানোর ষড়যন্ত্র থামায়নি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সরকার। ইসরাইলি সংবাদমাধ্যমের বরাত দিয়ে মিডল ইস্ট মনিটার জানিয়েছে, এ ব্যাপারে কয়েকটি দেশের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরাইলি কর্মকর্তারা। এর মধ্যে বিশেষ করে কঙ্গোর সঙ্গে জোর আলোচনা চলছে।

টাইমস অব ইসরাইলের মতে, গাজার লাখ লাখ বাসিন্দাকে কঙ্গো আশ্রয় দেবে কিনা সে ব্যাপারে দেশটির কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর যুদ্ধকালীন সরকার গোপনে আলাপ-আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।

 

ইসরাইলের নিরাপত্তা মন্ত্রণালয়ের এক সিনিয়র কর্মকর্তার বরাত দিয়ে টাইমস অব ইসরাইল বলেছে, ‘গাজার অধিবাসীদের অভিবাসী হিসেবে জায়গা দিতে রাজি হবে। এবং অন্যান্য দেশের সাথেও আলোচনা করছি।’

 

মিডল ইস্ট মনিটরের মতে, গত সোমবার (১ জানুয়ারি) নিজ দল লিকুদ পার্টির একটি অংশের সাথে এক বৈঠককালে নেতানিয়াহু ঘোষণা দিয়ে জানান, গাজার অধিবাসীদের অন্যান্য দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে জোর তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। তিনি বলেন, ‘আমাদের কাজ হলো সেসব খুঁজে বের করা যারা গাজাবাসীকে আশ্রয় দিতে রাজি হয়। আমরা এ ব্যাপারে কাজ করছি।’

ইসরাইলি পার্লামেন্ট সদস্য ড্যানি ডানোন সম্প্রতি দাবি করেছেন, ‘সারাবিশ্বই গাজাবাসীর ‘স্বেচ্ছা অভিবাসন’র সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করছেন।’ বৈঠকে নেতানিয়াহুও একই কথা উল্লেখ করেন। তবে তিনি স্বীকার করেন যে, গাজাবাসীকে আশ্রয় দিতে রাজি হবে এমন দেশ খুঁজে বের করা বেশ চ্যালেঞ্জের। তবে এরপরও চেষ্টা চালিয়ে যাবেন বলে জোর দেন তিনি।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট মতে, নেতানিয়াহু ছাড়াও ইসরাইলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ ও জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গভির গাজার ফিলিস্তিনিদের তাদের মাতৃভূমি থেকে উচ্ছেদ করতে দৌঁড়ঝাপ করছেন। এ ব্যাপারে মাঝে মাঝেই বক্তব্য ও বিবৃতি দিযে যাচ্ছেন।

ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ আলোচনা চালিয়ে গেলেও গাজাবাসীর উৎখাতের চিন্তার ব্যাপকভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ও উগ্রপন্থি দুই মন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ ও ইতামার বেন গভিরের বক্তব্যের কঠোর সমালোচনা করেছে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও জার্মানি।

 

যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা পরামর্শক জ্যাক সুলিভান বলেছেন, ‘গাজা ফিলিস্তিনের ভূখণ্ড এবং এটা তাদেরই থাকবে।’ মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর ইসরাইলি নেতাদের বক্তব্যের সমালোচনা করে বলেছে, বেজালেল ও বেন গভিরের বক্তব্য ‘উসকানিমূলক ও দায়িত্বজ্ঞানহীন।’

অপরদিকে ফ্রান্স বলেছে, ফিলিস্তিনিদের অন্যত্র সরানোর কথা বলে উগ্রপন্থি ইতামার বেন গিভির উত্তেজনা উস্কে দিচ্ছেন। দেশটি আরও বলেছে, জোরপূর্বক নাগরিকদের অন্যত্র স্থানান্তরিত করা আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন। ফিলিস্তিনিরা কোথায় থাকবে এবং তাদের ভবিষ্যৎ কেমন হবে সেটি একমাত্র তারাই নির্ধারণ করবে।